শাকিল ছিল জননেত্রীর অন্যতম আস্থার জায়গা

shamim“মৃতদের কান্নার কোন শব্দ থাকে না, থাকতে নেই,

নেই কোন ভাষা, কবরের কোন ভাষা নেই।
হতভাগ্য সে মরে যায় অকস্মাৎ বুকে নিয়ে স্মৃতি,
তোমাদের উত্তপ্ত সৃষ্টিমুখর রাতে।”
-মাহবুবুল হক শাকিল

ইতিহাসের পরিক্রমায় যুগে যুগে মানুষ এই পৃথিবীতে আসে আবার চলে যায়,এদের মাঝে কিছু মানুষ থাকে লোভ-লালসা মুক্ত,নির্মোহ,সাদামাটা তাঁরা আসেন আলোকবর্তিকা হাতে তারা প্রজন্মকে নিজের আলোয় আলোকিত করেন নিজে নিভৃত্বে থাকতেই পছন্দ করেন।এমনই একজন নিভৃত্বচারী মানুষ ছিলেন মাহবুবুল হক শাকিল,তিনি নেই এই কথাটি ভাবতেই কষ্ট হচ্ছে তারপরেও মেনে নিতে হচ্ছে এটাই নিয়তি সবাইকে চলে যেতে হয়।

মাহবুবুল হক শাকিলের সাথে আমার সম্পর্ক অনেক দিনের।শাকিলএকজন রাজপথ কাঁপানো সাবেক ছাত্রনেতা যার ভরাট কন্ঠের ভাষন ও শ্লোগানের সুখ্যাতি ছিল,ছাত্রজীবনে তিনি ছিলেন পরাজিত অপশক্তির মাথা ব্যাথার কারন।ছিপছিপে শ্যাম বর্নের চশমা পরা তুখোর এক ছাত্র নেতা দিন দিন নিজেকে পরিনত করেছিলেন প্রানপ্রিয় নেত্রীর অন্যতম আস্থার জায়গায়।

২০০১ সালে ক্ষমতার পট পরিবর্তন হলে শাকিলের সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগ আসে।তখন তাকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়,তাকে যতই দেখতাম ততোই আবাক হতাম,তিনি অসম্ভব সাহসী ছিলেন সাথে ছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতি দায়বদ্ধতা সর্বপরি জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি দায়বদ্ধতা।বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের গবেষনা প্রতিষ্ঠান সি আর আই যখন যাত্রা শুরু করে তখন আমি নিজে এর অন্যতম পৃষ্টপোষক হিসাবে লক্ষ্য করতাম শাকিলের কর্মকান্ড,কতই না গোছানো ছিল শাকিল,তার দূরদর্শিত কর্ম পরিকল্পনায় সি আর আই আজ শক্তিশালী অবস্থানে উপনিত হয়েছে,যতদিন সি আর আই থাকবে ততোদিন চির অম্লান থাকবে তার প্রতিষ্ঠাকালিন সময়ের অবদান।

২০০১ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির মাধ্যমে একাত্তরের পরাজিত শক্তি জামাত-বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর সারা দেশব্যাপী লক্ষ লক্ষ নেতা কর্মী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর চালানো নির্মম অত্যাচারে জাতি যখন হতবিব্বল,মনে হচ্ছিল একাত্তরের হায়েনারা আবার ফিরে এসেছে ক্ষত বিক্ষত করে চলেছে দাম দিয়ে কেনা লাল সবুজের পতাকা।ঠিক ঐ মূহুর্তে জননেত্রীর নির্দেশনায় ইন্জিনিয়ার ইনিষ্টিটিউট মিলনায়াতনে জোট সরকারের এসকল মানবতা বিরোধী অপরাধের চিত্র আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তুলে ধরার জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করেছিল সি আর আই,এই সম্মেলনের পূর্ব প্রস্তুতি আমার তৎকালিন বাংলামোটরের কনকর্ড টাওয়ার চতুর্থ তলায় অবস্থিত “ইউরো-বাংলা”অফিস হতে পরিচালিত হতো কারন তখন জোট সরকার সভানেত্রীর ধানমন্ডি অফিস অবরুদ্ধ করে রেখেছিল।ঐ সম্মেলনের সময় দেখেছি শাকিলের সাহসিকতা ও বিচক্ষনতা।সম্মেলনে যোগ দিতে আসা বিশিষ্ট মানবধিকার আইনজীবী উইলিয়াম স্লোন,নেপালের সহকারী স্পিকার ও অন্যান্য বিশ্ব বরেন্য ব্যাক্তি বর্গের সার্বিক নিরাপত্তা এবং গ্রেফতার এড়ানোর জন্য বিভিন্ন সময়ে গুলশানের বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়।আমাদের এসব পরিকল্পনা সিআইডির হাতে চলে যায়,তখন সিআইডি আমার অফিসে হানা দেয় আমাকে ও শাকিলকে হন্য হয়ে খুঁজতে থাকে,আমরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারতাম না,পুলিশ এতটাই অত্যাচার করা শুরু করলো যে,তাদের ভয়ে শাকিলের গাড়ির চালক পালিয়ে গেল তখন শাকিল নিজে গাড়ি চালিয়ে নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজ চালিয়ে গেছেন,এখানে উল্লখ্য শাকিল খুব ভাল গাড়ি চালাতেন।অধিকাংশ সময় শাকিল একাই বের হতেন নিজের জীবনের মায়া করতেন না,শুধু একটাই ব্রত ছিল কিভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কর্মীদের রক্ষা করা যায়,কিভাবে নেত্রীকে নিরাপদে রাখা যায়,ঐ সময়ে কোনদিনই শুনি নাই শাকিলের ব্যাক্তিগত কোন কিছু লাগবে,অথচো তখন তার পরিবার এবং মেয়েটি অনেক ছোট ছিল।মাঝে মাঝে পরিবারের কথা বলতো কিন্তু কখনো বিচলিত হতে দেখি নাই,শাকিলরা এমনই হয়,শাকিলদের সংখ্যা এই পৃথিবীতে অনেক কম।

১/১১ এর সময় শাকিল তখন সুধাসদনে অবস্থান করছে বাহিরে বের হলেই সেনাবাহিনী গ্রেফতার করবে এমন পরিস্থিতিতে ঘুমানোর বালিশ ছিল না কিছু পুরাতন পেপারের গাঁটের উপর মাথা রেখে পেপার বিছানো খালি ফ্লোরে ঘুমাতেন এই মন খারাপের গাড়ির চালক।নিজের সব আত্মত্যাগের বিনিময়ে সব সময় নেত্রীকে নিরাপদে রাখতে সচেষ্ট ছিলেন এবং নিজেকে নেত্রীর জন্য সপে দিয়েছিলেন।

শাকিলকে সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বার বার চোখে জল চলে আসছে,বার বার থেমে যাচ্ছি শেষাংশে শুধু একটি কথা বলবো

“শাকিল হাজার মানুষের মাঝে একটুকরো কাঁচা সোনা,যার অভাব কোনদিনই পূরন হবে না,সাহিত্য,কবিতা,সাংস্কৃতি ও রাজনীতি সহ সব জায়গায় তার বিচরন জাতি যুগ যুগ স্মরন করবে,শাকিল মরে নাই শাকিল মরতে পারে না,শাকিল বেঁচে আছেন খেরোখাতার পাতায় পাতায়”

লেখক: শামিম হক

যুগ্ন সম্পাদক সর্ব ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগ