মাত্র দুই বছরেই যেসব অসাধ্য সাধন করেছিলেন আনিসুল হক!

anisulবহুদিন পর কারো মৃত্যুতে প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। এই শোকের তীব্রতা পরিবারের নিকটতম আত্মীয়কে হারাবার চেয়ে কোন অংশে কম নয়। অন্য কারো মৃত্যুর সাথে আনিসুল হকের মৃত্যুর পার্থক্য আছে। এটা কেবল একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয় বরং অজস্র বাংলাদেশীর বহুল কাঙ্খিত একটা স্বপ্নের মৃত্যু, স্বপ্নটা ছিল বসবাসযোগ্য, সুশৃঙ্খল একটা রাজধানীর। এই স্বপ্ন উনার আগে কেউ দেখাতে পারেননি। উনি মাত্র দুবছরের মেয়রের দায়িত্ব পালনকালে এমনকিছু অসাধ্য সাধন করে দেখিয়েছিলেন যা আশাবাদী করে তুলেছিল রাজধানীর দেড় কোটি মানুষসহ সারাদেশের আপামর জনতাকে যে- ‘এবার হয়তো হবেই’!

কী এমন করেছিলেন উনি এই স্বল্পতম সময়ে? আসুন দেখে নেওয়া যাক।

২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্ব নিয়েই উনি দেখলেন সিটি কর্পোরেশন নিয়ে সবার বিস্তর অভিযোগ। সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নয় বরং এটা এক বিশাল দুর্নীতির আখড়ায় পরিবর্তিত হয়েছে সময়ের সাথে সাথে। সেই কালিমা ঘুচাবার জন্য দায়িত্ব হাতে নিয়েই তিনি প্রথম ধাপে ৩৬ জন ওয়ার্ড সচিবকে বদলি করেন। দ্বিতীয় ধাপে তৃতীয় শ্রেণীর ১৬৯ জন কর্মচারীকে রাতারাতি গণবদলি করেছিলেন যারা ৪ বছরের অধিক সময় একই দপ্তরে একই পদে কর্মরত ছিলেন । এরপর তৃতীয় ধাপে উনার পরিকল্পনা ছিল প্রথম শ্রেণীর কর্মকর্তাদেরও বদলি করবেন প্রয়োজন হলে। কিন্তু সেটার আর প্রয়োজন হয়নি কারণ ততদিনে সবাই বুঝে গেছেন এই মেয়রের আমলে এসব চলবে না! এছাড়াও তিনি সেক্টর ভিত্তিক পৃথক ১৬টি পর্যবেক্ষণ টিম গঠন করেছিলেন। যারা যেকোন সমস্যা দেখলেই দ্রুততম সময়ে মেয়রকে সেটা জানাতো।
এর কিছুদিন পর তেজগাঁও এ অবৈধ ট্রাক টার্মিনাল সরাতে যেয়ে রীতিমত উনাকে আটকে রেখেছিল শ্রমিকেরা। তারপরেও উনার আপোষহীন চরিত্রের কারণে অবশেষে সেটা করা সম্ভব হয়েছিল। একইভাবে কয়েকহাজার অবৈধ বিলবোর্ড সরানো, প্রভাবশালীদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, ওভারব্রিজগুলোকে পরিবেশবান্ধব গাছ দিয়ে সাজিয়ে তোলা, সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা এবং সমস্যার তড়িত সমাধান দেওয়া এমন অজস্র সফল উদ্যোগ প্রথমবারের মত উনিই নিয়েছিলেন। তবে এসব কিছুকে ছাপিয়ে নিজের এখতিয়ারের বাইরে এসে উন্নত দেশগুলোর মত ঢাকা শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে একটা শৃঙ্খলার মাঝে নিয়ে আসার উনার উদ্যোগটা সকলকে ভীষণভাবে আশাবাদী করে তুলেছিল।

বিমানবন্দর সড়কে যানজট কমাতে মহাখালী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কে ইউলুপ করার উদ্যোগ নেন আনিসুল হক। এরইমধ্যে মহাখালী থেকে উত্তরা পর্যন্ত ১১টি ইউটার্ন নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। বিশৃঙ্খল গাবতলী-সাভার সড়কে উনার কারণেই এখন পূর্বের তুলনায় অনেকটাই শৃঙ্খলা ফিরেছে। ‘ঢাকা চাকা’ নামক এসি বাস সার্ভিসও উনার উদ্যোগেরই ফসল। এর বাইরে যানজট নিরসনে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিল উনি। সেখান থেকে সবুজ সংকেত পাবার পর ঢাকার সব রুটের বাস মালিকদের নিয়ে বৈঠক করে তাদেরও রাজি করিয়েছিলেন বিদেশে যাবার কিছুদিন আগেই। কথা ছিল উনি দেশে ফিরে কীভাবে নতুন ৪০০০ বাস কেনা হবে, সেগুলোর ভাড়ার লভ্যাংশ বন্টন হবে এসব ঠিক করা হবে। কিন্তু উনার অকাল মৃত্যুতে এসবের আর কিছুই হলো না!

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিতে স্নাতক আনিসুল হক একসময় জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক ছিলেন। তারপর হঠাৎ করেই মিডিয়া জগৎ ছেড়ে ব্যবসায় প্রবেশ করেন। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাননি কখনো। সময়ের সাথে সাথে উনার নামের পাশে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন সাফল্যের পালক। ২০০৫ সালে বিজিএমই এর সভাপতি নির্বাচিত হন, ২০০৮-১০ মেয়াদে ছিলেন এফবিসিআই এর সভাপতি, ২০১০-১২ মেয়াদে সার্ক চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি। এছাড়া বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বিআইপিপিএরও সভাপতি ছিলেন তিনি। এরপর ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন থেকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে মেয়র নির্বাচিত হন।

উপরের যেকোন একটি পরিচয়ই একজন মানুষের জীবনকে ‘সফল’ বলার জন্য যথেষ্ট। অথচ উনি একাই এসকল কিছু অর্জন করেছিলেন। এরপরেও মানুষ হিসেবে ছিলেন বিনয়ী, মিষ্টিভাষী। তরুণদের সাথে কথা বলতে ভালোবাসতেন সুযোগ পেলেই। তাদের উৎসাহ দিতেন সবসময়। বলতেন- জীবনে যাই হোক আত্মবিশ্বাস না হারাতে, মা-বাবাকে ভালোবাসার কথা, উনার স্ত্রীর সংগ্রাম করে সফল হবার কথা। বর্তমান সময়ে এসব কথা আর কয়জন রাজনীতিবিদ বলেন?
টাকা পয়সা অর্জন নয় বরং প্রধানমন্ত্রীর আস্থার প্রতিদান দিয়ে ঢাকাবাসীকে বাসযোগ্য একটা শহর উপহার দিতে চেয়েছিলেন তিনি। সফল ব্যবসায়ী হবার পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সাপোর্ট থাকায় এবং উনার ভাই সেনাপ্রধান হওয়ায় অন্য আর কারো পক্ষে যেটা করা সম্ভব ছিল না কিংবা হবে না, সেটা উনি হয়ত করতে পারতেন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল উনি যখন বলেছেন তখন অবশ্যই ঢাকার পরিবহণের অরাজকতা বন্ধ হয়ে একটা শৃঙ্খলা আসবে নিশ্চিত ভাবেই। হয়ত সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরই নতুন কিছুর পরিকল্পনা নিয়ে আবারও চমকে দিতেন সকলকে। সে সব স্বপ্ন অধরাই থেকে গেল!
সবার কাছে গ্রহণযোগ্য আইকনের বড় অভাব আমাদের দেশে। রাজনীতিতে তো নেই বললেই চলে। সেখানে আনিসুল হক এক ব্যতিক্রম ছিলেন। এমন শিক্ষিত, স্মার্ট, দরাজ কন্ঠের অধিকারী, ভদ্র, মানবিক এবং আশাবাদী মানুষ সমসাময়িক সময়ে আর চোখে পরেনি। উনার চলে যাওয়া দেশের জন্য, তরুণ প্রজন্মের জন্য, ঢাকাবাসীর জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। কবিগুরুর ভাষায় বলতে হয়-

“তোমার কীর্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ
তাই তব জীবনের রথ
পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার বারংবার
চিহ্ন তব পরে আছে তুমি হেথা নাই।”

প্রিয় আনিসুল হক, আপনার এই শূন্যতা ভাষায় প্রকাশযোগ্য নয়, পূরণযোগ্য নয়। আগুন লাগার খবর শুনে সাঁঝ সকালে ট্রাউজার পরে আপনার মতো আর কেউ ভোর বেলা ছুটে যাবে না তদারকি করতে, কেউ পথশিশুদের শিশুমেলায় আমন্ত্রণ দিয়ে তাদের নিয়ে সময় কাটাবে না, বিদেশী হাইকমিশনের অবৈধ দখল করা ফুটপাত সরাসরি যেয়ে আর কেউ উচ্ছেদ করার সাহস পাবে না। সৎসাহস আর সদিচ্ছা থাকলে স্বল্পতম সময়ে কি করা যেতে পারে আপনি সেটা দেখিয়ে গেলেন। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে, তরুণ প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে আমি অন্তরের গভীর থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই আপনাকে। চেষ্টা করবো বাকি জীবন আপনার আদর্শকে নিজের মাঝে ধারণ করার। আপনি যেখানেই থাকুন ভালো থাকবেন। সৌজন্যেঃ এগিয়ে চলো