বিশ্বকে কাঁদিয়ে চলে গেলেন যেসব বিখ্যাত ব্যক্তি

manআন্তর্জাতিক অঙ্গনে নান কারণে উল্লেখযোগ্য সময় ছিল ২০১৫ সাল। বছরটিতে বিশ্ব হারিয়েছে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিরা। সেইসব প্রিয় মানুষগুলো শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি আর মাতাবেন না। হারিয়ে যাওয়া বিখ্যাতদের মধ্য থেকে কয়েকজনের কথা এখানে তুলে ধরা হল- লিওনার্ড নিময়: নিময় জন্মগ্রহণ করেন যুক্তরাজ্যের বোস্টন শহরে। তিনি একাধারে এক জন অভিনেতা ও চলচিত্র পরিচালক। অসাধারণ সব চলচিত্র দিয়ে এক সময় মাতিয়ে রেখেছেন হলিউড।

১৯৮৭ সালে তার চলচিত্র ‘থ্রি ম্যান অ্যান্ড এ বেবি’ বক্স অফিস হিট করে। তিনি স্টার ট্রেক সিরিজে মিস্টার স্পক চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সবচেয়ে বিখ্যাত। এছাড়া নিময় অন্যান্য চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেন এবং বেশ কিছু চলচ্চিত্র ও টিভি সিরিজ পরিচালনা করেছেন। ইউক্রেনীয় বংশোদ্ভূত এই মানুষটি ছিলেন ইহুদী ধর্মাবলম্বী। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের নানা জটিলতাসহ বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগে চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ৮৩ বছর বয়সে লস এঞ্জেলসের নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। আনিতা একবার্গ: ১৯৩১ সালে সুইডেনে জন্ম নেন একবার্গ।

১৯৬০ সালে নির্মিত পরিচালক ফেডরিকো ফেলিনির সিনেমা ‌’লা ডলস ভিটা’তে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। ২০ বছর বয়সে মিস সুইডেন খেতাব পেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান। আনিতা একবার্গ অভিনীত সিনেমাগুলো হল- বব হোপস নির্মিত হাস্য-রসাত্মক সিনেমা প্যারিস হলিডে (১৯৫৭) ও কল মি বোয়ানাতে (১৯৬৩) অভিনয় করেছেন। এছাড়া ব্লাড অ্যালি (১৯৫৬), হলিউড, বাস্ট (১৯৫৬) এবং ঐতিহাসিক মহাকাব্যিক সিনেমা ওয়ার এন্ড পিস (১৯৫৬)। তবে এই সুখ্যাতি খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। চলতি বছরের ১১ জানুয়ারি পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় নেন আনিতা একবার্গ। গুন্টার গ্রাস: ১৯২৭ সালের ১৬ অক্টোবরে জন্ম নেয়া গুন্টার গ্রাসও বিদায় নেন ২০১৫ সালে। সাহিত্যে নোবেলজয়ী জার্মান সাহিত্যিক ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, ভাস্কর এবং গ্রাফিক ডিজাইনার। জার্মানির কাশুবিয়ান আদিবাসী সম্প্রদায়ের এই মানুষটি দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে মুক্ত শহর ডানজিগে (বর্তমান দানস্ক, পোল্যান্ড) বেড়ে ওঠেন।

১৯৯৯ সালে সাহিত্যে নোবেল পাওয়া গ্রাসের প্রথম উপন্যাস ‘দ্য টিন ড্রাম’। এই উপন্যাসটি এতটাই খ্যাতি অর্জন করে যে এটি নিয়ে একই নামের চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে, যা ১৯৭৯ সালে পাম ডি’অর এবং সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্রের জন্য একাডেমি পুরস্কার অর্জন করে। লুবেক শহরে ৮৭ বছর বয়সে ফুসফুসের সংক্রমণ-জনিত কারণে মৃত্যু বরণ করা গ্রাসের আত্মজীবনী হল ‘পিলিং দ্য ওনিয়ন’। বি বি কিং: ১৯২৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বরে মিসিসিপিতে জন্মগ্রহণ করেন বি বি কিং। কৃষ্ণাঙ্গ এই গিটারবাদক যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত একজন গায়কও বটে। এরিক ক্ল্যাপটন ও স্টিভ মিলারের মতো কম বয়সী শিল্পীদের সঙ্গে কাজের মধ্য দিয়ে ১৯৬০ এর দশকে নতুন এক প্রজন্মের শ্রোতাদের সঙ্গে পরিচিত হন কিং।

সে সময় তার ‘দ্য থ্রিল ইজ গন’ দারুণ জনপ্রিয় হয়। এরপর আসে ‘লাইভ অ্যাট কাউন্টি কুক জেইল’ ও ‘বি বি কিং ইন লন্ডন’-এর মতো অ্যালবাম। চলতি বছরের ১৪ মে ৮৯ বছর বয়সে লাস ভেগাসে নিজের বাড়িতে ঘুমের মধ্যেই মারা যান ‘লুসিল’, ‘সুইট ব্ল্যাক অ্যাঞ্জেল’ আর ‘রক মি বেইবি’ গানের এই শিল্পী। সেতসুকো হারা: ১৯১৭ সালের ১৭ জুন জাপানের ইওকোহামাতে জন্ম নেন এই বিখ্যাত অভিনেত্রী। ১৯৪৯ সালে লেট স্প্রিং, ১৯৫৩ সালে টোকিও স্টোরিতে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা পান তিনি। সবচেয়ে বেশি চলচিত্রে অভিনয় করেছেন ১৯৩৫ থেকে ১৯৬৩ সালের মধ্যে। ২০১৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর জাপানের কানাগওয়াতে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। টেরি প্রাচেট: টেরি প্রাচেটের জন্ম দক্ষিণ-পূর্ব ইংল্যান্ডের বাকিংহামশায়ারের বিকন্সফিল্ডে ১৯৪৮ সালের ২৮ এপ্রিল। লেখক ক্যারিয়ারের শুরুতে সাংবাদিকতা পেশায় ছিলেন। আলঝেইমার ধরা পড়ার পরও নিয়মিত লেখালেখি চালিয়ে গেছেন প্রাচেট। তার ডিস্কওয়ার্ল্ডেও সর্বশেষ বই প্রকাশিত হয় ২০১৩ সালে। তার বিখ্যাত বইগুলোর মধ্যে গুড ওমেনস, ন্যাশন, পিরামিডস, মেকিং মানি, দ্য অ্যামেইজিং মরিস অ্যান্ড হিজ এডুকেটেড রডেন্টস, নাইট ওয়াচ, মোর্ট, গোয়িং পোস্টাল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

ব্রিটেনের এক সময়ের বেস্ট সেলিং ঔপন্যাসিক প্রাচেট তার ৪৪ বছরের লেখক ক্যারিয়ারে ৭০টির ওপর বই লিখেছেন। চলতি বছরের ১২ মার্চ ৬৬ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। ওমর শরিফ: ওমর শরিফ ওরফে মাইকেল দিমিত্রি শেলুব একজন মিশরীয় অভিনেতা। ১৯৩২ সালের ১০ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ওমর শরিফের ক্যারিয়ার শুরু ১৯৫৩ সালে। মিসরীয় ছবির নিয়মিত অভিনেতা থেকে হলিউডে তাঁর আবির্ভাব ঘটে ১৯৬২ সালের ক্ল্যাসিক ছবি ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’র মাধ্যমে। প্রথম ছবিতেই অস্কার মনোনয়ন পান তিনি। সঙ্গে জিতে নেন গোল্ডেন গ্লোব অ্যাওয়ার্ড। ২০০৫ সালের নভেম্বর বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রতি অসামান্য অবদানের জন্য তাঁকে সের্গেই আইজেনস্টাইন মেডেল দেওয়া হয় ইউনেস্কোর তরফ থেকে। ২০১৫ সালের ১০ জুলাই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ৮৩ বছর বয়স্ক এই অভিনেতা। রুথ রেনডেল: চলতি বছরের ২ মে ৮৫ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যান খ্যাতনামা ব্রিটিশ সাহিত্যিক রুথ রেনডেল।

তার পুরো নাম রুথ বারবারা রেনডেল, ব্যারোনেস রেনডেল অভ বাবের্গ, সিবিই। গোয়েন্দা সিরিজ ‘ইন্সপেক্টর ওয়েক্সফোর্ড’ লিখে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান ৬০টিরও বেশি উপন্যাসের রচয়িতা রেনডেল। জনপ্রিয় এ সিরিজটি নিয়ে পরে টেলিভিশন সিরিজ নির্মাণ করা হয়। এটিও ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তা পায়। রেনডেলের বই ছিল ব্রিটেনের সর্বাধিক বিক্রীত বইগুলোর অন্যতম। তার সাহিত্যকর্ম ২০টিরও বেশি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। ক্রিস্টোফার লি: ১৯২২ সালের ২৭ মে লন্ডনের বেলগ্রাভিয়াতে জন্ম নেন ক্রিস্টোফার লি। সাত দশকের বেশি সময় বিস্তৃত তাঁর অভিনয়জীবন। অভিনয় করেছেন ২৫০টির বেশি চলচ্চিত্রে। জেমস বন্ড ও দ্য লর্ড অব রিংস চলচ্চিত্রে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয়ের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিচিত। দ্য উইকার ম্যান ও স্টার ওয়ার্স চলচ্চিত্রেও এই অভিনেতার কীর্তি অনবদ্য। ২০০২ সালে ‘স্টার ওয়ার্স: এপিসোড টু – অ্যাটাক অব দি ক্লোনস’ এবং ২০০৫ সালে ‘স্টার ওয়ার্স: এপিসোড থ্রি – রিভেঞ্জ অব দি সিথ’ সিনেমায় খলচরিত্র কাউন্ট ডকুর চরিত্র রূপায়ন করেন তিনি। চলতি বছরের ৭ জুন ৯৩ বছর বয়সে মারা যান এই গুণী শিল্পী।

বেন ই কিং: ‘আর অ্যান্ড বি’ এই কিংবদন্তী সঙ্গীত শিল্পী ১০৩৮ সালের ২৮ মে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মূলত ধ্রুপদী ইংরেজি গানের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। পঞ্চাশের দশকের শেষদিকে তিনি তার সঙ্গীত ক্যারিয়ার শুরু করেন। ইংরেজি ছাড়াও এই গায়ক স্পেনিশ ভাষায় সাবলীল গান গাইতে পারতেন। তিনি ‘দেয়ার গউস মাই বেবী, দি ড্রিপ্তার এবং সেড দ্যা লাস্ট ড্যান্স গান গেয়ে গেয়ে সাড়া ফেলেন। তার একক এ্যালবাম “স্ট্যান্ড বাই মি” ১৯৬১ সালে ইউএস শীর্ষে পাঁচে স্থান দখল করে। সাইদ জাফরি: সাইদ জাফরি একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র অভিনেতা যিনি অনেকগুলো ব্রিটিশ চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। ১৯২৯ সালের ৮ই জানুয়ারি তিনি পাঞ্জাবের মালেরকোটলায় সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ‘দিল’, ‘কিষাণ কানহাইয়া’, ‘ঘর হো তো অ্যায়সা’, ‘রাজা কি আয়েগি বরাত’, ‘দিওয়ানা মস্তানা’, ‘মহব্বত’, ‘জব প্যার কিসিসে হোতা হ্যায়’, ‘আন্টি নম্বর ওয়ান’, ‘আলবেলা’সহ অনেক ছবিতে অভিনয়ের গুণে তিনি মুগ্ধ করেছেন সিনেপ্রেমীদের। হাজারো ভক্তকে কাঁদিয়ে ২০১৫ সালের ১৫ নভেম্বর তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।