জাতি গড়ার কারিগররা ঘুমাচ্ছেন রাস্তায়

teacherশিক্ষক! শিক্ষাদানের মহান ব্রতই তাদের কাজ। তারা জাতি গঠনের কারিগর। কিন্তু দাবি আদায়ে এ জাতি গড়ার কারিগররা ঘুমাচ্ছেন রাস্তায়! যেন দেখার কেউ নেই। এমপিওভুক্তির দাবিতে গত ২৫ ডিসেম্বর রাত থেকে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে জড় হন স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা। এরপর ২৬ ডিসেম্বর সকাল থেকে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন শিক্ষকরা। যা এখনও চলছে।

জানা গেছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো নন-এমপিও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একই কারিকুলাম, সিলেবাস ও প্রশ্নপদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। শিক্ষার্থীরা বোর্ড থেকে একই মানের সার্টিফিকেট অর্জন করে। যে কারণে স্বীকৃতির সময় থেকে তাদের বেতন পাওয়ার কথা। অথচ এখানকার শিক্ষকদের কোনো বেতন নেই। কবে বেতন হবে তাও তাদের জানা নেই। অন্যদিকে দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে ২১ লাখ চাকরিজীবীর বেতন বেড়েছে। প্রতি গ্রেডে বেতন বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এসব নন-এমপিও শিক্ষক-কর্মচারীর দুঃখ-বঞ্চনাও বেড়েছে।

স্বীকৃতিপ্রাপ্ত নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী ফেডারেশনের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যক্ষ গোলাম মাহমুদুন্নবী ডলার বলেন, দীর্ঘদিন থেকে দাবি আদায়ের লক্ষ্যে জেলা, বিভাগ ও ঢাকায় বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করলেও তা পূরণ হয়নি। বরং বিভিন্ন আশ্বাসের ভিত্তিতে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়। তাই এবার দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি চলবে।

এ অবস্থান কর্মসুচি পালন করতে ফুটপাতে দিন পার করছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা। শুক্রবার ভোরে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে গিয়ে দেখা, কনকনে শীতে কোনোরকম কাথা বা কম্বল জড়িয়ে ঘুমাচ্ছেন জাতী গড়ার এ কারিগররা। কারো মাথার ওপরে পলিথিনের ছাউনি থাকলেও অনেকেরই তা জোটেনি। এভাবেই কনকনে এ শীতের মধ্যে গত ৪ রাত পার করেছেন তারা।

খায়রুল আক্তার ফারুক। একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক তিনি। এসেছেন দিনাজপুরের বিরামপুর থেকে। কনকনে এ শীতে গত ৪ দিন এখানেই রাত কাটিয়েছেন এ শিক্ষক।

তিনি বিডি২৪লাইভকে বলেন, ‘জীবনে কখনও রাস্তায় ঘুমাইনি। কিন্তু এখন এসে রাস্তায় ঘুমাতে হচ্ছে। একজন শিক্ষক হয়েও রাস্তায় ঘুমাতে হবে, এটা কখনও কল্পনাও করিনি। বাড়িতে পিতা-মাতা, স্ত্রী, সন্তান আছে। কিন্তু তাদের ভরণপোষণ দিতে পারি না। সরকার থেকে ১টাকাও পাইনি। সংসার চালাতে আমাদের ঋণ করতে হচ্ছে। সবমিলিয়ে আমরা অবেহেলিত আছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাধ্য হয়েই আমরা রাস্তায় নামলাম। যদি সরকার আমাদেরকে রাস্তায় নামার পরেও ফেরত পাঠায়, তাহলে বুঝতে হবে, বিবেক শূন্য হয়ে যাওয়ার আগাম বার্তা এটি। তবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা আমাদের এ অবস্থান কর্মসূচি পালন করে যাব।’

অন্যদিকে বগুড়া থেকে আসা একটি টেকনিক্যাল কলেজের শিক্ষক আবু সাঈদ বিডি২৪লাইভকে বলেন, ‘আমি ১৫ বছর ধরে শিক্ষকতা করছি। জীবনে কখনও দেখিনি শিক্ষকদের রাস্তায় ঘুমাতে হয়েছে। কিন্তু আমরা বাধ্য হয়েই এখানে এসেছি। এখানে অনেক শীত। খুবই কষ্ট হয়। প্রধানমন্ত্রী যদি আমাদের বিষয়টা দেখতেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক শিক্ষক বলেন, ‘অনেক বছর ধরে শিক্ষকতা করছি, কিন্তু সরকার থেকে ১টাকাও পাইনি। আমার স্ত্রী সেলাইয়ের কাজ করে। তার টাকা দিয়েই আমাদের সংসার চলছে। ঢাকায় আসার সময় আমার সন্তান আমাকে বলল, বাড়ি ফেরার সময় তার জন্য শীতের কাপড় আনতে। কিন্তু আমি মুখফুটে তাকে বলতে পারিনি, ঢাকায় একটি হোটেলে থাকার টাকাও আমার পকেটে নেই। খুবই কষ্ট লাগে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে আমরা আমাদের দাবি আদায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের শান্তনা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। এরপর আর খবর থাকে না। আমরা শিক্ষক মানুষ, তাই এমন কিছু করতে পারি না যা দৃষ্টিকটু হয়। তাই বাধ্য হয়ে এবার অবস্থান কর্মসূচি পালন করছি। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ঘরে ফিরে যাব না।’