কেমন কেটেছিল জাতির পিতার পরিবারের ১৬ ডিসেম্বর’ ১৯৭১?

pita১৬ই ডিসেম্বর আমাদের মহান বিজয় দিবস। ১৯৭১ সালের এইদিনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বাংলাদেশ ও ভারতের মিত্রবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে। বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত সারা দেশের মানুষ, একই সাথে স্বজন হারানোর ব্যথা বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে! কিন্তু যার ডাকে সাড়া দিয়ে নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ছিনিয়ে আনা হল বহু আকাঙ্খিত স্বাধীনতার লাল সূর্য, কেমন ছিল সেই মহান নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার ৭১ এর সেই ১৬ ই ডিসেম্বর? তা জানার আগে আমাদের ফিরতে হবে মধ্য একাত্তরে।

২৫ শে মার্চ ১৯৭১ এর সেই কালরাতে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানী বাহিনী তাঁকে অন্তরীন করে রাখে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের অভ্যন্তরে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল ও কলেজের এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। এদিকে ২৫শে মার্চের বিভীষিকা শুরু হওয়ার আগেই ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে দেয়াল টপকে শেখ কামাল ও বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত দেহরক্ষী মহীউদ্দিন যুদ্ধে যোগদানের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে যান। বাড়ীতে ছিলেন শেখ জামাল, শেখ রাসেল ও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী, জননেত্রী শেখ হাসিনা সেসময় অন্তসত্বা থাকায় শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে উনি আগেই চলে গিয়েছিলেন ওনার স্বামী বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী জনাব এম এ ওয়াজেদ মিয়ার ধানমন্ডির ১৫ নং রোডের বাড়িতে। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর, বেগম মুজিব শেখ রাসেল ও শেখ জামালকে নিয়ে অসহায় অবস্থায় আশ্রয় নেন পার্শ্ববর্তী প্রতিবেশীদের বাড়িতে। ২৭ শে মার্চ ওনাদের সন্ধানে বের হন বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই মমিনুল হক খোকা। নিজের জীবনের মায়া তুচ্ছ করে খোকা সাহেব তাঁর মোহাম্মদপুরের বাড়ি থেকে লালমাটিয়া ও ধানমন্ডির বিভিন্ন অলিগলি পেড়িয়ে এসে পৌঁছান বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িতে। সেখানে গিয়ে প্রত্যক্ষ করেন পাকিস্তানী বর্বর সৈন্যদের এক তান্ডবলীলা। সেখান থেকে পাশের বাড়িতে গিয়ে সেই বাড়ির নিচের তলায় দেখা পেয়ে যান, বেগম মুজিব, শেখ রাসেল ও শেখ জামালের। বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়ার জন্য বের হতেই তিনি সামনে পেয়ে যান আজকের ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি কে, যিনি ছিলেন শেখ কামালের বন্ধু। তাঁর গাড়িতে করেই বঙ্গবন্ধুর পরিবার গিয়ে পৌঁছায় ধানমন্ডির দুই নম্বর রোডের মোরশেদ মাহমুদের (মাহমুদুর রহমান বেনুর বড়ভাই, মাহমুদুর রহমান বেনুকে আমরা মুক্তির গানে বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পীসংস্থা’র ব্যানারে দেশের আনাচে কানাচে মুক্তির গান গাইতে দেখেছি ৭১ এর প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে।?) বাসায়, কিন্তু সে বাসার সদস্যদের বাসা ছেড়ে দেয়ার তোড়জোড় দেখে এরপর বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যরা যান ধানমন্ডির ১৫ নং রোডের ক্যাপ্টেন এম রহমানের বাসায়। সেখান থেকে বিভিন্ন স্থানে এরপর থাকতে হয়েছে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে সেই বিপদসংকুল সময়ে, সীমাহীন অশান্তি ও মানুষ নামে কলংক কিছু প্রানীর লাঞ্চনা, গঞ্জনা সহ্য করে। সে আরেক ইতিহাস।

যাহোক, এবাসা ওবাসা করে বঙ্গবন্ধুর পরিবার থিঁতু হয়েছে তৎকালীন মগবাজার পেট্রোল পাম্পের পাশের এক গলির ভেতরের বাসায়। সেখান থেকে শেখ কামালের খোঁজে বেগম মুজিব মমিনুল হক খোকাকে পাঠান আমৃত্যু বঙ্গবন্ধুর সুহৃদ ও দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিঞার বাসায়। সেখানে গিয়েই তিনি জানতে পারেন যে, মানিক মিঞার ছোটছেলে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুকে পাকিস্তানী সৈন্যরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং প্রায়ই মানিক মিঞার পরিবারের কাছে পাকিস্তানী সেনাবাহীনীর কর্মকর্তারা আসে বঙ্গবন্ধু পরিবারের খোঁজে। সেখানেই মানিক মিঞার স্ত্রী বললেন বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে খুঁজে বের করার পাকিবাহিনীর হুমকির কথা। এরমধ্যেই মগবাজারের সেই বাসায় গিয়ে হাজির হন, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও তার মা। তারা গিয়ে বেগম মুজিবকে বোঝাতে থাকেন যে, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর হেফাযতে যাওয়ার জন্য। কিন্তু, কোনভাবেই বেগম মুজিব এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না।

এরপর একদিন আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর বাসা থেকে খবর আসে সেখানে যাওয়ার জন্য। মমিনুল হক খোকা সেখানে গিয়ে দেখেন পাকিস্তানী আই এস আই এর এক কর্মকর্তা জেনারেল ওমর বসে আছে সেখানে। সেখানে যাওয়ার পরপরই সেই অফিসার তাঁকে চাপ দিতে থাকে, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের খোঁজ দেয়ার জন্য। এরপর কোথায় উঠতে চান তাঁরা সে মোতাবেক বাসা দেখিয়ে দিতে বলে। যদিও প্রথমে সেই অফিসার প্রস্তাব দিয়েছিল, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বা তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের কোন বড় শহরে তাঁদের স্থানান্তরের জন্য। এরপরেই ঠিক হয়, ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের সেই বাসার, যেখানে ১৮ ই ডিসেম্বর পাকিবাহিনীর বন্দী অবস্থা থেকে মুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত ছিল বঙ্গবন্ধু পরিবারের বাস।

১৬ই ডিসেম্বর ১৯৭১। বাংলাদেশ সেদিন স্বাধীনতা লাভ করে খুনে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনীর নিগর থেকে। বাংলার আপামর জনসাধারণ স্বাধীনতার স্বাদ লাভ করলেও তখন পর্যন্ত ধানমন্ডির ১৮ নম্বর সড়কের এক বাড়িতে অন্তরীন জাতির পিতার পরিবার। পাকিস্তানী সেনাবাহিনী রেসকোর্স ময়দানে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর যৌথকমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে ঠিকই, কিন্তু ১৮ নম্বর সড়কের এক বাড়ি যেন তখনও স্বাধীন বাংলাদেশের বাইরে! পাকিস্থানী সৈন্যরা ঘিরে রেখেছে সেই বাড়ি। এখানেই আটক আছে বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবার। বাইরে শোনা যাচ্ছে জনতার আনন্দধ্বনি, কিন্তু এত কাছ থেকেও বঙ্গবন্ধু পরিবারের কাছে স্বাধীনতা ছিল অনাস্বাদিত এক বিরল নাম!

পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণ করার পরও পুরো দুইদিন লেগে যায় বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে খুঁজে পেতে। ১৭ই ডিসেম্বর মেজর অশোক কুমার তারা ভারতীয় সেনাবাহিনীর ডিভিশনাল কমান্ডার মেজর জেনারেল গনজালভেসের কাছ থেকে নির্দেশ পান বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের উদ্ধারের। মেজর তারা ও তাঁর ১৪ গার্ডস ইউনিট ইতিপূর্বেই ৩রা ডিসেম্বরের এক যুদ্ধে আগরতলার সন্নিকটে গঙ্গাসাগর রেলওয়ে স্টেশন পাকিস্তানী বাহিনীর থেকে দখল নেন।

১৮ নম্বর সড়কের যে বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে অন্তরীন রাখা হয়েছিল, তার পাহারায় ছিল প্রায় এক ডজনের মত পাকিস্তানী বাহিনীর সদস্য, যাদের সাথে ছিল রাইফেল ও হালকা মেশিনগান। অবশেষে ১৭ ই ডিসেম্বর ১৯৭১, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্যদের উদ্ধার করতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ১৪ গার্ডস ইউনিট কোম্পানী কমান্ডার মেজর অশোক কুমার তারা, মাত্র তিনজন সৈন্য নিয়ে এ অভিযান পরিচালনা করেন মেজর তারা। মেজর তারা সেই বাড়ির সন্নিকটে পৌঁছার পরই বাড়ির ভেতরে অবস্থান নেয়া পাকিবাহিনীর এক সদস্য তাঁকে হুমকি দেয়, যে সে যদি সেখান থেকে সরে না যায়, তাহলে তাঁকে গুলি করা হবে। উল্লেখ্য সেই বাড়ির বাইরে পৌঁছিয়েই মেজর তারা দেখতে পান, বুলেটে ঝাঁঝড়া হয়ে যাওয়া একটি গাড়ি পরে আছে, ভেতরে একটি মৃতদেহ।

গুলির হুমকি শুনে ঘাবড়ে না গিয়ে উল্টো নিজের হাতে থাকা হাতিয়ার তাঁর সাথে থাকা এক সৈন্যর কাছে রেখে নিরস্ত্র অবস্থায় বাড়ির দিকে এগিয়ে যান। বাড়ির ভেতর থেকে হুমকি আসে, মেশিনগানের নল তাঁর দিকে তাঁক করা আছে, সে যেন আর সামনে না আগায়। এরমধ্যেই মেজর তারা ভেতরের সৈনিকদের সাথে কথা চালিয়ে যেতে থাকেন। এরমধ্যেই এক যুবক পাকিসেনা মেজর তারার বুকের দিকে তাঁক করে তার রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খোঁচা দিতে থাকে।

এভাবে কেঁটে যায় প্রায় দশ মিনিট। এরই মধ্যে পাক সুবেদার মেজর, মেজর তারার কাছে এক ঘন্টা সময় চাইলো। মেজর তারা সেই অনুরোধে রাজি হয়ে ফিরে যেতে উদ্যত হলেই, মমিনুল হক খোকা মেজর তারাকে ডেকে বলেন, যে মেজর তারা পাকিবাহিনীকে সময় দিলেই তারা বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। এ কথা শুনেই মেজর তারা পাকিবাহিনীর সদস্যদের নিরস্ত্র করেন এবং তাদের সাধারণ পোশাক পড়িয়ে তাঁর সাথে নিয়ে যান, তার আগে নিশ্চিত করেন যে, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সকল সদস্য নিরাপদে আছেন। ভেতরে গিয়ে মেজর তারা দেখতে পান নবজাতক সন্তান সজীব ওয়াজেদ জয়সহ শেখ হাসিনা মেঝেতে শয্যা পেতেছিলেন বন্দী থাকাকালীন সময়ে, শেষ দুইদিন কোন খাবারও ছিল না বঙ্গবন্ধুর পরিবারের কাছে। শুধু বিস্কিট খেয়ে কাঁটিয়েছিলেন তারা স্বাধীন দেশে দুইদিন!

যদিও মেজর তারার ইউনিট ফিরে যায় মিজোরামের পার্বত্য অঞ্চলে তাদের কর্তব্য পালনে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু পরিবারের, বিশেষ করে বেগম মুজিবের অনুরোধে মেজর তারা রয়ে যান বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসা পর্যন্ত। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর সাথে মেজর তারা দেখা করতে এলে বেগম মুজিব মমিনুল হক খোকাকে বলেন তাঁর জন্য একটি ঘড়ি কিনে নিয়ে আসতে এবং তা নিজ হাতে পড়িয়ে দিতে।

বেগম মুজিব নিজের কাছে থাকা কিছু মুক্তোর গহনা উপহার দেন মেজর তারার স্ত্রীকে। মেজর তারার সাথে পরবর্তীতে শেখ রেহানার চিঠিতে যোগাযোগ বজায় থাকে। পরবর্তীতে ২০১২ সালের বিজয়ের মাস ডিসেম্বরে মেজর তারা (পরবর্তীতে কর্নেল হিসেবে ভারতীয় সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত ও বীর চক্র খেতাবপ্রাপ্ত হন।) কে “ফ্রেন্ডস অফ বাংলাদেশ” খেতাবে ভূষিত করা হয় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে।

তথ্য সংগ্রহ : এম নুর এ আলম, (সাংবাদিক)