একাত্তরের অন্যতম কুটনৈতিক যোদ্ধা শ্রী অনিল দাসগুপ্ত

onilবাঙালি জাতির হাজার বছরের সংগ্রামের ইতিহাস ও ইতিহাসের প্রবাহমান ধারায় মহান মুক্তি সংগ্রাম এবং একাত্তর সালের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়,সর্বশ্রেষ্ঠ ঘটনা।হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ,দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত দিশেহারা জাতিকে দিয়েছিল লাল সবুজের পতাকা এবং স্বাধীন এক ভূখন্ড।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বিশ্লেষকরা দুইটি অংশে বিভক্ত করেছেন-

প্রথম অংশে রনাঙ্গনের সম্মুখ যুদ্ধ এবং দ্বিতীয় অংশে প্রবাসী বাঙালিদের বিশ্ব জনমতকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে আনার জন্য কুটনৈতিক যুদ্ধ।এখানে উল্লেখ্য যে তৎকালিন মার্কিন যুক্তরাষ্টের প্রত্যক্ষ বিরোধিতার কারনে এই কাজটি ছিল খুবই কঠিন তথা দুঃস্বাধ্য ব্যাপারও বটে তারপরেও তৎকালিন প্রবাসী দামাল বাংলা মায়ের সন্তানেরা সেই সময়ের মহা পরাক্রমশালী যুক্তরাষ্ট্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে দেশ মাতৃকার প্রতি অগাধ ভালবাসা ও প্রবল দায়বদ্ধতার কারনে ঝাপিয়ে পরেছিলেন অসম কুটনৈতিক যুদ্ধে,যে যুদ্ধ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে তুলতে অগ্রনী ভূমিকা রেখেছিল।

একাত্তরের কুটনৈতিক যোদ্ধাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জার্মান প্রবাসী শ্রী অনিল দাসগুপ্ত,বর্তমানে তিনি সর্ব-ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সংগ্রামী সভাপতির দায়িত্ব সফলতার সহিত পালন করছেন।তিনি ছাত্রজীবন থেকেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন।তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এর ফল স্বরুপ ছাত্রবৃত্তি নিয়ে জার্মানিতে হাইড্রোলিক ইন্জিনিয়ারিং বিষয়ে কৃতিত্বের সহিত অধ্যায়ন শেষ করে চাকুরি জীবন শুরু করেন।এর মাঝেই বাঙালি জাতির জীবনে একাত্তরের পঁচিশে মার্চ কালো রাত নেমে আসে,তিনি পাকিস্তানি বর্বর বাহিনীর আক্রমণ ও গনহত্যার ভয়াবহতার সংবাদ আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমের কল্যানে জানতে পারেন,তাৎক্ষনিক তিনি সিদ্ধান্ত নেন জার্মানিতে বসে আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ স্থাপন করবেন যাতে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডল বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে সাহায্য করে।

তৎকালিন সময়ে জার্মানিতে পাঁচ ছয় জন বাঙালি ছিলেন এমনকি দূতাবাসেও কোন বাঙালি কর্মকর্তা ছিল না,এমতাবস্থায় তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গনহত্যা চিত্র তুলে ধরে জার্মান সহ অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহের নেত্রীবৃন্দের কাছে চিঠি লেখার সিদ্ধান্ত নেন।সিদ্ধান্ত মোতাবেক চিঠি লেখা শুরু করলেন,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সে সময়ের সরকার পাকিস্তানের পক্ষে থাকলেও অনেক নেতা ছিলেন যারা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছিলেন,তিনি সিনেটর কেনেডির কাছে পরিস্থিতি তুলে ধরে চিঠি দিয়েছিলেন,কয়েকদিনের মধ্যে কেনেডি জবাব দিলেন,এর কিছু দিন পরে সিনেটর কেনেডি স্বচক্ষে পাকিস্তানি অত্যাচারের চিত্র দেখতে ভারতে এসেছিলেন যা ছিল বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারের অন্যতম কুটনৈতিক সাফল্য,এভাবে তিনি আরো অনেক বিশ্বনেতাকে চিঠি দিয়েছিলেন।

এরপরে তিনি জার্মানির এমপি ও বিরোধী দলের নেতাদের সাথে যোগাযোগ শুরু করেন,তাদের অফিস ও বাড়িতে গিয়ে বাংলাদেশের গনহত্যার পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করেন।তার এ প্রচেষ্টার জন্য জার্মানির এমপিরা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং বাংলাদেশের শরনার্থীদের জন্য সাহায্য করতে চায় এবং সাহায্য হিসাবে তারা ঔষুধ অনিল দাশগুপ্তের কাছে তুলে দেয়,তিনি সব ঔষুধ তার এক বন্ধুর গুদামে সংরক্ষন করে প্রবাসী সরকারের সাথে যোগাযোগ করে এয়ার ইন্ডিয়ার বিমানে পাঠানোর ব্যাবস্থা করেন।

ঠিক ঐ মুহুর্ত্বে প্রবাসী সরকারের কোলকাতা মিশনের প্রধান হোসেন আলী তাকে চিঠি লিখে তার কর্মকান্ডের প্রশংসা করত কার্যক্রম চালিয়ে যেতে অনুরোধ করেন।মুক্তিযুদ্ধের সময় তার কর্মকান্ডের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু তৎকালিন ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী তাকে চিঠি লেখেন,চিঠিটি এখনো তার কাছে সংরক্ষিত আছে।কোলকাতা মিশনের প্রধান হোসেন আলি তাকে তিন দফায় চিঠি পাঠান,প্রথম চিঠিটি তিনি জার্মানিতে হাতে পান একুশে আগস্ট,দ্বিতীয় চিঠি ষোলোই নভেম্বর এবং সর্বশেষ চিঠি ডিসেম্বর মাসে তার কাছে পৌছায়।শেষ চিঠিতে ইংরেজীতে লেখা ছিল-

“country will remember your contribution for the nation”

onil-chitiশ্রদ্ধেয় হোসেন আলির চিঠির লাইনের সাথে একাত্ততা প্রকাশ করে ঘোষনা করছি ” বাবু অনিল দাশগুপ্ত,বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ কালিন সময়ে আপনার স্বপ্রোনদিত অংশগ্রহন শুধু বাঙালি জাতিই না বিশ্বের সকল মুক্তিকামী মানুষ যুগ যুগ স্মরন করবে,আপনি যুগ যুগ বেঁচে থাকবেন বাংলার লাল সবুজের জমিনে ইতিহাসের সূর্য সন্তান হিসাবে”

ধন্যি মায়ের ধন্য সন্তান শ্রী অনিল দাশগুপ্ত আপনার কাছে চির ঋণি আমরা স্বাধীন প্রজন্ম তথা সমগ্র বাংলাদেশ।।

লেখক ঃ এম এম নুর এ আলম, (সাংবাদিক)